ঢাকা , শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঠাকুরগাঁও সীমান্তে এক যুগে ঝরল ২৬ প্রাণ

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ১৮-০৯-২০২৬ ০২:৪০:০০ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ১৮-০৯-২০২৬ ০২:৪০:০০ অপরাহ্ন
ঠাকুরগাঁও সীমান্তে এক যুগে ঝরল ২৬ প্রাণ ফাইল ছবি
সীমান্তের কাছাকাছি গেলেই ভয়। জমিতে ঘাস কাটতে, নদীতে মাছ ধরতে কিংবা আত্মীয়ের বাড়িতে যেতে গিয়েও ফিরতে হবে কি না, সেই শঙ্কা থাকে সীমান্তঘেঁষা মানুষের মধ্যে। গত এক যুগে ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে অন্তত ২৬ বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও অনেকে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে ২৪ বাংলাদেশি নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। এরপর চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে পীরগঞ্জের চান্দেরহাট সীমান্তে গুলিতে আরও দুজন নিহত হন। সর্বশেষ এই ঘটনা সীমান্তে প্রাণহানির বিষয়টি আবারও সামনে এনেছে।

গত ১২ সেপ্টেম্বর ভোরে পীরগঞ্জ উপজেলার চান্দেরহাট সীমান্তের ৩৩৩ নম্বর সীমান্ত পিলারের কাছে বিএসএফের গুলিতে আহত হন তিন বাংলাদেশি। তারা হলেন দক্ষিণ ইন্দ্রইল গ্রামের আবদুল ওয়াজেদের ছেলে আসাদুল হক (৩৮), উত্তর ইন্দ্রইল গ্রামের আহেদ আলীর ছেলে মোস্তাকিম এবং একই এলাকার মুনষা নারায়ণের ছেলে শ্রী উদা রায়।

গুলিবিদ্ধ তিনজনকেই ভারতের রায়গঞ্জের কালিয়াগঞ্জ স্টেট জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আসাদুল হক ও মোস্তাকিম মারা যান। শ্রী উদা রায়কে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আটক করেছে। ঘটনার প্রায় ৩৬ ঘণ্টা পর ১৩ সেপ্টেম্বর রাতে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে আসাদুল হকের মরদেহ বাংলাদেশে ফেরত আনা হয়। মোস্তাকিম ও শ্রী উদা রায় তখনো ভারতের হেফাজতে ছিলেন।

ঠাকুরগাঁও ৫০ বিজিবির আওতায় হরিপুর, রাণীশংকৈল, বালিয়াডাঙ্গী ও আংশিক পীরগঞ্জ উপজেলার বিস্তীর্ণ সীমান্ত এলাকা রয়েছে। এ এলাকায় ১৯টি সীমান্ত ফাঁড়ি বা বিওপি রয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি ঠাকুরগাঁওয়ে এবং তিনটি পঞ্চগড়ে। বেউরঝাড়ী, কান্তিভিটা, রত্নাই, বজরুক, মুন্ডুমালা, জগদল, চাপসার, নাগরভিটা ও কান্দালসহ বিভিন্ন সীমান্তে বিভিন্ন সময়ে গুলিতে বাংলাদেশি নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। কখনো সীমান্তের কাছ থেকে মরদেহ উদ্ধার হয়েছে, কখনো ভারতের ভেতর থেকে মরদেহ ফেরত আনা হয়েছে। আবার কোনো কোনো ঘটনায় গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আটক করেছে।

২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এসব ঘটনায় নিহতদের কেউ গিয়েছিলেন আত্মীয়ের বাড়িতে, কেউ ঘাস কাটতে, কেউ মাছ ধরতে। আবার কেউ সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা করছিলেন বলে বিজিবি ও বিএসএফের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। নিহতদের অনেকের ক্ষেত্রেই পরে ‘চোরাকারবারি’ বা ‘অবৈধভাবে সীমান্ত পারাপারের চেষ্টা’ করার অভিযোগ সামনে এসেছে। তবে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের অনেকেই এসব অভিযোগ মানতে নারাজ।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে হরিপুরের চাপসার সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত হন রাসেল। তার মা সেলিনা বেগম এখনো ছেলেকে হারানোর শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি।

তিনি বলেন, ‘মোর ছুয়াডা একটু বোকা ছিল। মানুষ কী বুঝাইছে আর কী ভেবে গেছে বুঝি না। কিন্তু তাই বলে গুলি করে মারবে? রাসেলের মতো অনেক পরিবারই এখন স্বজন হারানোর ক্ষত নিয়ে দিন কাটাচ্ছে। কারও সন্তান পিতৃহারা হয়েছে, কারও সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটি নেই। কোনো কোনো পরিবারে চিকিৎসা কিংবা দৈনন্দিন খরচ চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।’

রাণীশংকৈলের ধর্মগড় সীমান্তে গত বছরের সেপ্টেম্বরে বিএসএফের গুলিতে নিহত হয় ১৫ বছর বয়সী জয়ন্ত। নানার বাড়িতে যাওয়ার পথে সে গুলিবিদ্ধ হয়। ছেলেকে উদ্ধার করতে গিয়ে তার বাবা মহাদেবও গুলিবিদ্ধ হন। জয়ন্তের নানির কান্না এখনো থামেনি। পরিবারের সদস্যরা বলছেন, একটি সীমান্তের ঘটনা তাদের পরিবারের স্বাভাবিক জীবনটাই বদলে দিয়েছে।

বালিয়াডাঙ্গীর মুন্ডুমালা সীমান্তে নিহত শাহ আলমের পরিবারেও একই চিত্র। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে তার মা-বাবা অসহায় হয়ে পড়েছেন।

বেউরঝাড়ী সীমান্তে নিহত নুরুজ্জামানের স্ত্রী আলেফা বেগম বলেন, স্বামী ছাড়া সংসার চলে না। দুই ছেলেকে নিয়ে কী করি? নুরুজ্জামানকে চোরাকারবারি বলা হলেও তার পরিবার তা মানতে নারাজ।

সীমান্তঘেঁষা মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সীমান্ত এলাকায় বসবাস করলেও অনেকেই সব সময় একধরনের আতঙ্কের মধ্যে থাকেন। কৃষিকাজ, ঘাস কাটা কিংবা গবাদিপশুর জন্য ঘাস সংগ্রহের মতো কাজেও সীমান্তের কাছাকাছি গেলে তাঁদের সতর্ক থাকতে হয়।

সীমান্ত এলাকার ব্যবসায়ী মানিক বলেন, আমরা চাই সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া হোক। তাহলে বিএসএফ আর আমাদের চোরাকারবারি বলে দোষ চাপাতে পারবে না।

সাংস্কৃতিক কর্মী মাসুদ আহম্মেদ সূবর্ণ মনে করেন, সীমান্তে প্রাণহানি বন্ধে দুই দেশের মধ্যে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন।

তেল-গ্যাস রক্ষা কমিটির সদস্যসচিব মাহাবুব আলম রুবেল বলেন, সীমান্তে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা দরকার। ফেলানীর মতো অনেক পরিবার এখনো ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে।

ঠাকুরগাঁও লিগ্যাল এইড অফিসার (সিনিয়র সহকারী জজ) মজনু মিয়া সীমান্তে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ড নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সীমান্তে যেসব মানুষ নিহত হয়েছেন, তাদের পরিবারের কেউ এখনো ন্যায়ের জন্য লিগ্যাল এইড অফিসে আসেননি। অথচ এই দেশের প্রতিটি নাগরিকই সংবিধান অনুযায়ী বিচার পাওয়ার পূর্ণ অধিকার রাখে। আইন কখনো কাউকে একা ফেলে রাখে না।

তিনি আরও বলেন, বিচার চাওয়া কোনো অপরাধ নয়, এটা একজন মানুষের মৌলিক অধিকার। যদি কোনো ভুক্তভোগী পরিবার আমাদের কাছে আসে, আমরা বিনা খরচে প্রয়োজনীয় সব ধরনের আইনি সহায়তা দেব। মামলা করার প্রয়োজন হলে সে পথও আমরা খুলে দেব। সীমান্তে যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের পরিবার যেন ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হয় এটা রাষ্ট্রের দায়, আর সেই দায় পালন করতেই আমরা এখানে আছি।

ঠাকুরগাঁও ৫০ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল আখলাকুর রহমান সাংবাদিকদের  বলেন, সীমান্তে প্রাণহানির অন্যতম কারণ হলো সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা। মানুষ সীমান্ত না পেরোলে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার সুযোগ কমে যায়। সীমান্ত-সংলগ্ন মানুষকে নিয়মিত সচেতন করা হচ্ছে। স্থানীয় ইমাম, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদেরও এ কাজে যুক্ত করা হয়েছে। মানুষ সচেতন হলে, আইন মেনে চললে এবং সহযোগিতা করলে সীমান্ত আরও শান্ত হবে।

বিজিবির এই কর্মকর্তা জানান, রংপুর রিজিয়নের অধীনে চারটি সেক্টর ও ১৫টি ব্যাটালিয়নের দায়িত্বে প্রায় ১ হাজার ৬৬০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। এর মধ্যে ঠাকুরগাঁও সীমান্তের দৈর্ঘ্য ১০৬ দশমিক ৪ কিলোমিটার। মানব পাচার ও মাদক প্রতিরোধের পাশাপাশি সীমান্তে প্রাণহানি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে নিরলসভাবে কাজ করছে বিজিবি।

বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন  
 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ